ফাইল ছবি
ধীরে ধীরে করোনাভাইরাস সংক্রমণ কমতে শুরু করবে—বিশেষজ্ঞরা এমন পূর্বাভাস দিলেও তাঁরা বলছেন, মৃত্যু কমতে আরো দু-এক সপ্তাহ সময় নেবে। সংক্রমণ কমাকে এক সপ্তাহ ধরে চলমান কঠোর লকডাউনের সুফল হিসেবেই বিবেচনা করা যাবে—এটাও মনে করছেন তাঁরা।
তাঁদের মতে, এখন যারা মারা যাচ্ছে তারা মূলত আরো দু-এক সপ্তাহ আগে সংক্রমিত হয়েছিল। তখন শনাক্ত ছিল এখনকার তুলনায় প্রায় অর্ধেক বা তার চেয়ে কম। তখনকার সংক্রমণের আনুপাতিক হারে মৃত্যু দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। এখন সংক্রমণ যে মাত্রায় আছে সেই অনুপাতে সামনে সে হারেই মৃত্যু অব্যাহত থাকতে পারে বলে তাঁদের আশঙ্কা।
তবে কেউ কেউ এমন পূর্বাভাসের সঙ্গে একমত নন। তাঁরা বলছেন যে এবারও প্রত্যাশিত মাত্রায় লকডাউন কার্যকর হয়নি। তাই প্রত্যাশা অনুপাতে সুফল আশা করা যায় না। বড়জোর সংক্রমণ ও মৃত্যুর গতি কিছুটা ধীর হবে।
এদিকে দেশে করোনাভাইরাসে দৈনিক মৃত্যুর সংখ্যা ১০০ জনের উপরেই থাকছে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে। এর মধ্যে গত দুই দিনে তা ২০০ জনের ওপরে-নিচে ওঠানামা করল। সব শেষে গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছে ১৯৯ জন। এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৬৫ জন মারা গেছে ঢাকায়। আগের দিন বুধবার মারা গেছে ২০১ জন। তার আগের দিন মারা যায় ১৬৩ জন। অর্থাৎ মঙ্গলবারের পরের ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু এক লাফে ৩৮ জন বেড়ে যায়।
অন্যদিকে গত ২৭ জুনের আগ পর্যন্ত দৈনিক হিসাবে মৃত্যু ১০০ জনের নিচেই ছিল বেশির ভাগ সময়। এর আগে চলতি বছরের এপ্রিলে তিন দিন মৃত্যু ১০০ ছাড়িয়ে ছিল। সর্বশেষ গত দুই-তিন দিনে মৃত্যুর এমন উল্লম্ফনের বড় অংশই ঘটেছে খুলনা ও ঢাকায়। আবার মৃত ব্যক্তিদের মধ্যে এখনো সর্বোচ্চসংখ্যকই থাকছেন পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সের মানুষ। যাঁরা আগে থেকেই নানা রোগের জটিলতায় ভুগছিলেন। গত আট দিনে বাসায় মারা গেছে ৮৪ জন করোনার রোগী।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ১ জুলাই লকডাউন শুরুর দিন থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দেশে মোট নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে ৬৭ হাজার ৬০০ জন। সুস্থ হয়েছে ৩৫ হাজার ৪৩৩ জন এবং মারা গেছে এক হাজার ১৪৬ জন। গতকাল সকাল ৮টার আগে দেশে মোট পজিটিভ রোগীর সংখ্যা (বাসা, হাসপাতাল ও আইসোলেশনসহ) এক লাখ ১৭ হাজার ৮১ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, এই পজিটিভ রোগীদের মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি ছিল ১০ হাজার ৩৯ জন বা প্রায় ৯ শতাংশ। বাকিদের মধ্যে ৫৯ হাজার ৩৪৩ জন ছিল আইসোলেশনে। এর পরও ৬৯ হাজার ৩৮২ জনের অবস্থান কোথায় তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কোনো তথ্যে।
দেশে এখন করোনায় মোট মৃত্যুহার আগের তুলনায় কিছুটা বেড়ে ১.৬০ শতাংশে উঠেছে। তবে দৈনিক মৃত্যুর গড় গত এপ্রিল থেকে মাঝেমধ্যেই ২ থেকে ৩ শতাংশে উঠে যাচ্ছে। এমনকি এক দিন তা ৮ শতাংশেও ছিল বলে উল্লেখ রয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগে থেকে বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্তদের করোনা সংক্রমণের ব্যাপারে অধিকতর সতর্ক না থাকা এবং করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর দ্রুত হাসপাতালে না আসায় ঢাকার বাইরে বিভিন্ন এলাকায় মৃত্যু বেশি হচ্ছে। তবে অনেক জেলায় অধিকতর জটিল বা তীব্র শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে আসা রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় উচ্চমাত্রার অক্সিজেন থেরাপির হাইফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলার ব্যবস্থা না থাকায় মৃত্যুসংখ্যা বেশি হচ্ছে বলেও মনে করছেন কেউ কেউ।
আরেক ধরনের মানুষের মৃত্যু হচ্ছে যাদের আগের জটিলতা থাকার পরও আগে থেকে করোনাকে পাত্তা দেয়নি এবং যখন করোনায় আক্রান্ত হয়ে পড়ে তখনো উপসর্গ নিয়েই বাড়িতেই থেকে যায়। এরা হাসপাতালে যেতে চায় না বা পরিবারের লোকজন হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় মাত্রায় সক্রিয় হয় না। এই শ্রেণির রোগীদের অবস্থা যখন অত্যধিক জটিল হয়ে পড়ে, তীব্র শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়, তখন শেষ মুহূর্তে অনেককে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। আবার কেউ কেউ সেই সময়টুকুও আর পায় না, বাড়িতেই মারা যায়। শেষ সময়ে এদের যখন হাসপাতালে আনা হয়, তখন তাদের ফুসফুস ও অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ প্রায় বিকল হয়ে যায়। আবার তাদের জন্য তাত্ক্ষণিক প্রয়োজনীয় হাই ফ্লো কিংবা ভেন্টিলেটর হয়তো স্বাস্থ্যকেন্দ্রে থাকে না।
গতকাল বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার হিসাবে দেশে ১৯৯ জনের মৃত্যুর পাশাপাশি শনাক্ত হয়েছে ১১ হাজার ৬৫১ জন। সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত মোট শনাক্ত হয়েছে ৯ লাখ ৮৯ হাজার ২১৯ জন। এর মধ্যে মারা গেছে ১৫ হাজার ৭৯২ জন এবং সুস্থ হয়েছে আট লাখ ৫৬ হাজার ৩৪৬ জন। ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়েছে পাঁচ হাজার ৮৪৪ জন। ২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত হার উঠেছে ৩১.৬২ শতাংশে।
২৪ ঘণ্টায় মৃত ১৯৯ জনের মধ্যে ১৩৩ জন পুরুষ ও ৬৬ জন নারী। যাদের বয়স ১১ থেকে ২০ বছরের দুজন, ২১ থেকে ৩০ বছরের ৯ জন, ৩১ থেকে ৪০ বছরের ছয়জন, ৪১ থেকে ৫০ বছরের ২৮ জন, ৫১ থেকে ৬০ বছরের ৪৭ জন ও ষাটোর্ধ্ব ১০৭ জন। বিভাগওয়ারি হিসাবে ঢাকা বিভাগে মারা গেছে ৬৫ জন, খুলনায় ৫৫ জন, চট্টগ্রামে ৩৭ জন, রাজশাহীতে ১৫ জন, ময়মনসিংহে ১০ জন, রংপুরে ৯ জন, সিলেটে পাঁচজন এবং বরিশালে তিনজন। যাদের মধ্যে সরকারি হাসপাতালে মারা গেছে ১৪৫ জন, বেসরকারি হাসপাতালে ৪২ জন এবং বাসায় মারা গেছে ১২ জন। গত ১ জুলাই থেকে গতকাল পর্যন্ত আট দিনে বাসায় মারা গেছে ৮৪ জন।