পবিত্র রমজান মুমিনের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ দান ও উপহার। মহানবী (সা.) রমজান মাস লাভের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া ও প্রার্থনা করতেন। পবিত্র কোরআনে রোজা ফরজ করার উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘হে মুমিনরা, তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল পূর্ববর্তীদের ওপর; যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৩)
সুতরাং একজন মুমিন রজমানের দিনগুলোতে বেশি বেশি ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করবে, তাকওয়া তথা আল্লাহভীতির জীবনযাপন করবে। কিন্তু করোনা মহামারির কারণে রমজানের চেনাচিত্র বদলে যায় অনেকটাই। গত বছর সারা বিশ্বের মুসলিমরা অবরুদ্ধ রমজান কাটিয়েছে। সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় এ বছরও মানুষ ক্রমেই ঘরবন্দি হয়ে পড়ছে। প্রশ্ন হচ্ছে করোনাকালে মুসলিমরা কিভাবে ইবাদত-বন্দেগি করবে?
ইসলাম জীবনকেই অগ্রাধিকার দেয়
ইসলাম জীবন ও বাস্তবতাবিরোধী একরৈখিক, নৃশংস ও নির্মম কোনো ধর্ম নয়; ইসলাম মানুষের জীবনঘনিষ্ঠ ও মানবপ্রকৃতির অনুকূল জীবনবিধন। বর্তমানে যে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে তা থেকে দেশ ও জাতিকে রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাশ ও বিকল্প পদ্ধতিও তাতে আছে। ইসলামী শরিয়তের মূলনীতি হলো যখন মানুষের জীবনরক্ষা ও শরিয়তের বিধান পালনের প্রশ্ন এক হয়, তখন ইসলাম জীবনরক্ষার দিকটিই অগ্রাধিকার দেয়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘কেউ তার ঈমান আনার পর আল্লাহকে অস্বীকার করলে এবং কুফরির জন্য হূদয় উন্মুক্ত রাখলে তার ওপর আপতিত হবে আল্লাহর গজব এবং তার জন্য আছে মহাশাস্তি; তবে তার জন্য নয়, যাকে কুফরির জন্য বাধ্য করা হয় কিন্তু তার অন্তর ঈমানে অবিচলিত।’ (সুরা নাহল, আয়াত : ১০৬)
মুমিন অন্তর ব্যথিত হবে
উল্লিখিত আয়াতে দুটি বিষয় লক্ষণীয়—এক. অপারগ হয়ে কুফরির মতো অপরাধ করলেও আল্লাহ ক্ষমা করেন, দুই. অন্তর ঈমানে অবিচল থাকবে। করোনাকালীন সময়ের সঙ্গে যদি আমরা মিলিয়ে বলি, তাহলে বলতে হবে স্বাস্থ্যবিধি রক্ষার্থে যদি কেউ মসজিদে যেতে না পারেন তবে আল্লাহ তাঁর এই ত্রুটি মার্জনা করবেন। আর তাঁর অন্তর ব্যথিত হলে আল্লাহ তাঁকে আগের মতো প্রতিদান দেবেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন ঈমানদার অসুস্থ হয়ে পড়ে, তখন ফেরেশতারা বলেন, হে আমাদের প্রতিপালক, আপনার অমুক বান্দা অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তখন আল্লাহ বলেন, সে সুস্থ হওয়া পর্যন্ত অথবা তার মৃত্যুবরণ করা পর্যন্ত তার আমলনামায় সেরূপ আমলের সাওয়াব লিখতে থাকো, যেরূপ আমল সে সুস্থ থাকা অবস্থায় করত।’ (মুসনাদে আহমদ)
অপারগ ব্যক্তি কে
কোনো ব্যক্তি অপারগ কি না তা সে নিজেই নির্ধারণ করবে না; বরং স্বাস্থ্যবিষয়ক কোনো কিছু হলে দ্বিনদার ও আল্লাহভীরু চিকিৎসকরাই ব্যক্তির অবস্থা ও বাস্তবতার আলোকে করণীয় নির্ধারণ করবেন। করোনা বিষয়ে বিশ্বের প্রায় সব মুসলিম ও অমুসলিম চিকিৎসক এক মত যে প্রয়োজনীয় সতর্কতা, স্বাস্থ্যবিধি ও চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে। তবে বাজার ও গার্মেন্ট ফ্যাক্টরির মতো জনসমাগমস্থল খোলা রেখে মসজিদের ব্যাপারে আরো বেশি কঠোরতা আরোপ ও আরো বেশি সংকোচন নীতি গ্রহণ করা বাস্তবতা ও ইসলামী শরিয়তের মূলনীতিবিরোধী।
উপায়-উপকরণ গ্রহণ
ইসলাম প্রয়োজনীয় সতর্কতা ও উপায়-উপকরণ গ্রহণের নিদের্শ দেয়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর আপনি যখন তাদের মধ্যে অবস্থান করবেন ও তাদের সঙ্গে নামাজ আদায় করবেন, তখন তাদের একদল যেন তোমাদের সঙ্গে দাঁড়ায় এবং তারা যেন সশস্ত্র থাকে।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ১০২)
উল্লিখিত আয়াতে আল্লাহ রাসুল (সা.)-এর উপস্থিতি সত্ত্বেও যুদ্ধাবস্থার কারণে আল্লাহ সশস্ত্র থাকার নির্দেশ দিয়েছেন, যা থেকে প্রমাণিত হয়, ভীতির পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা ও উপকরণ গ্রহণ করাই ইসলামের নির্দেশনা। কারোনাভাইরাসের সংক্রমণে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তা মানবসভ্যতার জন্য কিছুতেই যুদ্ধের চেয়ে কম ভয়ের নয়।