অনলাইন ডেস্ক ১৯ নভেম্বর ২০২১,
এবারের চলমান ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) নির্বাচনে মেম্বার প্রার্থীদের ঘিরেই সহিংসতা বেশি হচ্ছে। মেম্বার (সদস্য) প্রার্থীদের মধ্যে আধিপত্যকে বিস্তারকে কেন্দ্র করে অধিকাংশ জায়গায় সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে গত ৮ নভেম্বর মেহেরপুর ও গত ৪ নভেম্বর নরসিংদীর সহিংসতা মেম্বার প্রার্থীদের কেন্দ্র করেই।
চেয়ারম্যান প্রার্থীদের মতো মেম্বার প্রার্থীরাও এবারের ভোটে জবরদস্তি বা প্রভাব বিস্তার করছেন। ২৫৪জন চেয়ারম্যানের সঙ্গে ৮৩৪জন মেম্বার ভোট ছাড়াই নির্বাচিত হয়েছেন। অন্যবারের তুলনায় যে কারণে মেম্বার প্রার্থীরা সহিংসতা জড়াচ্ছেন বেশি। বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও নির্বাচন কমিশন (ইসি) সূত্রে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
সরকার ও ইসি থেকে বারবার সহিংসতা প্রতিরোধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হলেও তা প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না। নির্বাচনে কালো টাকা ও মাদকসেবীদের প্রভাবের কারণে অস্ত্রের ব্যবহারও বেড়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও কার্যত এসব সহিংসতা রোধ করতে পারছে না।
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সহিংসতার প্রশ্নের জবাবে গত বুধবার সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, এই নির্বাচনে আমরা শুধু চেয়ারম্যান পদে প্রতীক দিচ্ছি, কিন্তু মেম্বার পদে কোনো প্রতীক নেই। তাদের কোনো প্রতীক থাকে না। আপনারা যদি ঘটনাগুলো দেখেন, মেম্বারদের মধ্যেও গোলমাল। শুধু যে চেয়ারম্যান প্রতীক দিচ্ছি দেখেই মারামারি তা কিন্তু না।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে নির্বাচনী সহিংসতা অনেক কমিয়ে আনা হয়েছে, তবে এটা ঠিক, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সহিংসতা আগেও হয়েছে। এখনও হোক সেটা চাই না। একটা হানাহানি, ভোট দিতে গিয়ে মানুষের প্রাণ যাবে এটা কখনও গ্রহণযোগ্য নয়।
এখন পর্যন্ত ইউপি নির্বাচনে প্রায় ৪৩জনের প্রাণহানি ঘটেছে। বেশিরভাগ সদস্য প্রার্থীদের কারণেই। সদস্য প্রার্থীদের সঙ্গে আছেন বিদ্রোহীরাও। সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে দ্বিতীয়ধাপের ভোটে। মূলত ভোটে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপি বর্জন করায় ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা (চেয়ারম্যানের সঙ্গে মেম্বার) বিনাভোটে নির্বাচিত হওয়ার প্রতিযোগিতার কারণেই সহিংসতা হচ্ছে। তিনধাপে ২৫৪জন ইউপি চেয়ারম্যান বিনাভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। চেয়ারম্যানদের পাশাপাশি পিছিয়ে নেই মেম্বার প্রার্থীরাও। তিনধাপে ৮৩৪জন মেম্বার ভোট ছাড়াই নির্বাচিত হয়েছেন। এর মধ্যে ৬১৪জন সাধারণ সদস্য এবং ২২০জন সংরক্ষিত সদস্য।
আগামী ২৮ নভেম্বর অনুষ্ঠিতব্য তৃতীয়ধাপের ১০০৪ ইউপির মধ্যে ১০০জন চেয়ারম্যান ভোটছাড়াই নির্বাচিত। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সাধারণ সদস্য হয়েছেন ৩৩৭জন এবং সংরক্ষিত সদস্য ১৩২জন। গত ১১ নভেম্বর অনুষ্ঠিত দ্বিতীয়ধাপের ৮৩৩টি ইউপির মধ্যে মধ্যে চেয়ারম্যান পদে ৮১জন, সংরক্ষিত নারী সাধারণ সদস্য পদে ৭৬ জন এবং সাধারণ সদস্য পদে রয়েছেন ২০৩ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। এর আগে গত ২০জুন ও ২০ সেপ্টেম্বর দু’দফায় প্রথমধাপে ৩৬৫টি ইউপির ভোট অনুষ্ঠিত হয়। গত ২০ জুন অনুষ্ঠিত ২০৪টি ইউপির মধ্যে ২৮জন চেয়ারম্যান বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।
এছাড়াও ভোট ছাড়া সংরক্ষিত ওয়ার্ড সদস্য হিসাবে ৫ জন এবং সাধারণ সদস্য হিসাবে ২৯ জন নির্বাচিত হন। এর আগে গত ২০ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত প্রথমধাপের স্থগিত ১৬১ ইউপির মধ্যে ৪৫জন চেয়ারম্যান, সংরক্ষিত সদস্য ৭জন এবং সাধারণ সদস্য ৪৫জন বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।
স্থানীয়ভাবে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব
ইউপি ভোটের ফাঁকা মাঠে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা দ্বন্দ্বে জড়াচ্ছেন। ট্রাম্পকার্ড হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছেন মেম্বার প্রার্থীরা। বিভিন্ন বলয় থেকে তৃণমূলে মেম্বার প্রার্থীদের সমর্থনও দেওয়া হচ্ছে। কোথাও স্থানীয় সংসদ সদস্য আবার কোথাও উপজেলা চেয়ারম্যান আবার উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি/সাধারণ সম্পাদকের নিজ নিজ বলয় প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে সহিংসতা বাড়ছে বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে। আরও জানা গেছে, এবারের ভোটে মাদকসেবী ও কালোটাকার প্রভাব অনেক বেশি।
বিদ্রোহীরাও পিছিয়ে নেই
এ পর্যন্ত দুইধাপে ১১৯৭টি ইউপির ভোট সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ৭৫৬টি ইউপিতে জয়লাভ করেছে। এর মধ্যে ভোট ছাড়াই রয়েছেন ২৫৪জন। সরাসরি ভোটে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন ৫০২টি ইউপিতে। অন্যদিকে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়লাভ করেছে ৪১৬টি ইউপিতে। যাদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগের বিদ্রোহীরা। স্বতন্ত্রদের মধ্যে প্রায় শতাধিক ইউপিতে জয়ী আবার বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। এছাড়াও জাতীয় পার্টি-জাপা ১৩টি, জাতীয় পার্টি-জেপি-৫টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ৪টি, অন্যান্য দলের ৩জন বিজয়ী হয়েছেন। বেশিরভাগ জায়গায় আওয়ামী লীগের মুখোমুখি আওয়ামী লীগের বিদ্রোহীরা। ভোটে জয়ী হতে বিদ্রোহীদের প্রভাব বিস্তারের কারণে সহিংসতাও বেড়েছে।